Pages

Monday, 12 September 2016

প্রথম কিস্তি



~ পাঁজরে মিনে করা জন্মনাম ~
নিথর। অত্যন্ত নিথর সমস্ত আয়োজন। শুধু জন্মদিনের আলো বিম্ বিম্ করছে। সাহেব ডাকনাম কার দেয়া, বাবাই ডাকনাম কার দেয়া, টমেটো ডাকনাম কার দেয়া – মনে প’ড়ে যাচ্ছে। ম’রে যাওয়ার আগে মানুষ যেরম ক’রে কাশে সেরম একপিস কাশি উপত্যকা মাতিয়ে দিচ্ছে সপ্তাহযাবৎ। এসময় ফোন বাজলে ঝাঁটপত্র জ্বলে। ওকে বালিশের খোলে লুকিয়ে রাখা হয়। দুনিয়ার যেসব বাড়িতে আজ বেলুন ফোলানো হয়েছে বিভিন্ন কারণে, তাদের সকলকে আমি একটা ক’রে তুরূপ উপহার দেবো। কাকতালীয় রঙের।


~ “জ্বর এলো নুপুর বাজিয়ে” ~
সাহেব পাঁচ-দশ সেকেন্ডের বেশি জিভের তলায় থার্মোমিটার রাখতে পারে না। গা গোলায়। সাহেবের বগল থেকে থার্মোমিটার বের ক’রে চোখের সামনে ধরলেন মাধুকরী – “একশো তিন”... তারপর রাজকীয় থার্মোমিটার বার’কয়েক ঝাঁকিয়ে ঢুকিয়ে রাখলেন স্যাঁতস্যাঁতে কাগজের খাপে (সাহেবদের মুসলমান পাড়ার ভাড়াবাড়িটিতে অসম্ভব ড্যাম্প আর সাহেবরা ব্রাহ্মন, ব’লে রাখা দরকার)।
‘রবিবার’ এক আশ্চর্য স্কুল। মাধুকরীবাবু (সাহেবের বাবা) সেখানে আঁকা শেখান। মাঝেমাঝে অরিগ্যামি শেখানো হয়। মাঝেমঝে ক্যালাইডোস্কোপ বানানো। সকালবেলা আঁকা ও বিকেলবেলা কোলকাতা থেকে আসা ছাত্রদের কথাবলাপুতুল শেখান মাধুকরীবাবু। দুপুরবেলা শক্তিমান দ্যাখেন
পাশের মসজিদে একফাঁকে সাহেবকে নিয়ে ঘুরে এলেন জ্যোৎস্না। সঙ্গে একটা স্টেনলেস স্টিলের গ্লাসভর্তি জল। থুতনির দাড়ি দুলিয়ে গ্লাসের জলে ফুঁ দিয়ে সাহেবকে খাওয়ানো হলো জলপোড়া। বিকেলে গড়াইবাবুর চেম্বার খুলবে।
তারপর রাত্রে শুয়ে শুয়ে সাহেব ভাবলো – এই যে একটা লোক ফুঁ দিলো একগ্লাস জলে। আর সঙ্গে সঙ্গে জলের স্বাদটা ক্যামন পুড়ে গ্যালো, পাল্টে গ্যালো। এটাও একটা ম্যাজিক।



~  সিপিএম যবে যাইবে দুনিয়া ছাড়ি- ~    
(সিপিএম যবে যাইবে দুনিয়া ছাড়ি,
সব তরবারি হইবে সেদিন কাষ্ঠের তরবারি)
স্থানঃ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
চরিত্রঃ হারবার্ট আর হিমু (বালকেরা কেউ যাদবপুর পড়ুয়া নয়...)   

হারবার্ট – সকাল সকাল পুরো হ্যাসটা মেরে দিলাম বাঞ্চত! এখন পেটে কিছু না পড়লে, জাস্ট মোরে যাবো!
হিমু – আমার বেল্টটা খাবি?
হারবার্ট – ধুর!
হিমু – ক্যানো?
হারবার্ট – আমার চাইনিজ খেতে ভালো লাগেনা!!


~ যেখানে ভ্যানিশদাদু মাছেদের কথা বলাতেন ~
বাড়াবাড়ি রৌদ্রজনিত কারণেই ‘আজানডাঙা’ প্লাটফর্ম অন্যান্য দিন হইতে গম্ভীর বুঝিবা। সুনীল এক নির্জন সিমেন্টনির্মিত সিটে তার ঝোলা রাখিয়া হাঁফ ছাড়িল।
সুনীল ক্রাচ লইয়া হাঁটে। কাঠের ক্রাচ। যুবক ক্রাচ।
ক্রাচের মধ্যবর্তী খাঁজে হাঁটু গুঁজে দাঁড়াইয়া, সুনীল নাটুকে ভঙ্গিমায় গল্প বলিয়া এক’দুইটি কয়েনের ভেলকি দেখাইতে শুরু করিল। সুনীলকে কেন্দ্র করিয়া আলুঝালু জটলা, বৃত্ত বানাইয়া ফেলিল। বুড়ো আঙুল ছিঁড়িয়া, ফের তাহা জোড়া লাগাইবার মজা দেখাইয়া সুনীল শেষমেশ অধিক মানুষজন টানিয়া আনিল। তারপর সে মাজন বেচিতে শুরু করিল। কিছু মাজন বিক্রি হইল। বেশি মাজন হইল না।
বিভিন্ন প্লাটফর্ম ঘুরিয়া বেড়ায় সুনীল। প্রত্যহ। ভেলকি দেখাইয়া লোক জড়ো করা এবং তাহাদের মধ্যে মাজন বিক্রি করাই সুনীলের পেশা। আজ ‘আজানডাঙা’।
সুনীলের তাবৎ ওস্তাদি যিনি অনুপুঙ্খ দেখিতেছিলেন তিনি কুয়াশার পাশে দাঁড়াইয়া আছেন। ভ্যানিশদাদু।
সুনীলের কাছে আসিয়া ভ্যানিশদাদু বলিলেন
– আমার কাছে ভোজবাজি শিখিবে?
- তাহাতে কী হইবে?
- খ্যাতি হইবে, টাকা হইবে, মেডেল হইবে
- মেডেলে কী হইবে?
- কোটের বুকে ঝোলাইয়া ঘুরিবে।
- কোটও হইবে?
- হুঁ। কালোকোট।
- আমাকে কী করিতে হইবে?
- কেবল আমার সঙ্গে যাইতে হইবে।
অতঃপর ভ্যানিশদাদু সুনীলের দুই ভুরুর মাঝখানে তর্জনী ঠেকাইয়া ফিসফিস করিয়া বলিলেন
– অ্যাবরা-কা-ড্যাবরা!
কেউ বুঝিতে পারিল না, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে এতোটুকু ছোট হইয়া গেল সুনীল। সুনীলের ক্রাচ।
ভ্যানিশদাদু উহাদের হাতের তালুতে লইয়া, প্লাটফর্ম যেদিকে রেললাইনে মিশিয়াছে, সেইদিকে হাঁটিতে লাগিলেন। এবং হাঁটিতে হাঁটিতে নীল দাগ হইয়া গেলেন।


~ “ইয়ে দুনিয়া অগর মিলভি যায়ে তো কেয়া হ্যায়...” ~
সিগারেটে গাঁজা ভ’রে খেলে তাকে রিফার বলা হয়। আমি শ্যাওড়াফুলি ফিরলে বাথরুমে ঢুকে রিফার খাই। আজ, এইমাত্র, একটা রিফার খাওয়া শেষ ক’রে লক্ষ্য করলাম – বাথরুমের ওপরের দিকে একটা লম্বাটে আয়তক্ষেত্র টাইপের ফাঁক আছে। আজ সেই ফাঁক দিয়ে রিফারের ধোঁয়া আর রোদ্দুর পরস্পরের বিপরীতে কী অনায়াস হয়ে গিয়ে সাইকাডেলিক সাইকাডেলিক খেলছে। মনে হলো – অনুরাগ কশ্যপের সিনেমা দেখছি।


~ যে-সব গলির ছেলে প্রথাগত সাঁতার শেখে না ~
টুকুনের তো দেড় বছরে বাবা আর তেরো বছরে মা মারা গ্যাছে। বাবার বাড়ির গন্ধ তার কিচ্ছু মনে থাকার কথা নয়। কারণ দেড় বছর থেকে সে যে বাড়িটায় মানুষ হয়েছে, সেটা আচারে তার মামার বাড়ি, আচরণে দাদুর।
টুকুনের দাদু ধনী ও বনেদি। তদুপরি রক্ষণশীলইংরেজ তাঁকে কবিভূষণ উপাধি দিয়েছে। কবিতা লেখার জন্য নয়। উনি নামকরা কবিরাজ ছিলেন ব’লে।
দাদুর ঘরের রাশভারী দরজার কাছে মাথানিচু দাঁড়ালো টুকুন।
- দাদু! আমি ম্যাজিক শিখতে চাই।
- ক্যানো?
- আমি ম্যাজিশিয়ান হবো।
- তামশাওয়ালা!
টুকুন জানতো। লুকিয়েই করতে হবে, যা করার। টুকুন বড়ো হয়ে ম্যাজিশিয়ান হবে। টুকুন শোভাবাজারে থাকে। শোভাবাজার উত্তর কোলকাতায়।



ক্রমশ...